বিজ্ঞান ও ধর্মের কি একে অপরকে প্রয়োজন?

প্রকৌশলী মুহাম্মাদ আরীফুল ইসলাম

বিজ্ঞান ও ধর্ম এ দু’টি কি পরস্পর বিরোধী, না-কি একে অপরের পরিপূরক? এটা একটা কঠিন প্রশ্ন, তাই নয় কি? তবে হ্যাঁ, শুরুটাই হ্যাঁ দিয়ে করা যাক। ইসলাম একটি বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম এবং এ ধর্মের মহাগ্রন্থ আল-কুরআনও বিজ্ঞানময়। ইসলাম শুধু কিছু আচারসর্বস্ব ধর্ম নয়, বরং একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান (Complete code of Life)। এ জীবনের পালনীয়/নিষিদ্ধ যাবতীয় বিষয়াদি সর্বশক্তিমান, সৃষ্টিকর্তা, সকল বিজ্ঞানীর ঊর্ধ্বে মহাবিজ্ঞানী মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ও শেখানো এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ) কর্তৃক শেখানো ও প্রচারকৃত। আধুনিক শিক্ষিত নাস্তিক্যবাদী বা অন্যান্য মতবাদের যেকোন ব্যক্তি বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা যতই অস্বীকার করুক না কেন, ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পালনীয় ওযূ-গোসল, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয়, আচার-ব্যবহার, কেনা-বেচা ইত্যাদির সবকিছুই বিজ্ঞানসম্মত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে এসবের উপকারিতা প্রমাণিত। যেকোন শিক্ষিত ব্যক্তি কুরআন মাজীদ ও কুতুবে সিত্তাহ (বুখারী, মুসলিম, আবুদাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ) খুলে উল্লিখিত বিষয়গুলি অধ্যায় ও বিষয়বস্ত্ত অনুসারে বিশ্লেষণ করে দেখতে পারেন।

জীবনের অন্যান্য গন্ডী তথা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিকতা ইত্যাদিও মহান আল্লাহর আইন অনুযায়ী এবং নবী করীম (ছাঃ)-এর বিদায় হজ্জের ভাষণ অনুযায়ী বৈজ্ঞানিকভাবে বিধিবদ্ধ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গাণিতিক। আমরা স্বীকার করি বা না-ই করি, এসব গন্ডীর যেকোনটির (পরিবার, সমাজ…) যেকোন উপাদান নিয়ে উদ্ভাবনী চিন্তাশীলগণ গাণিতিক আরোহ (Mathematical Induction) পদ্ধতিতে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে দেখতে পারেন যে, আল্লাহর নির্ধারিত আইনের বাইরে গেলে ঐ উপাদানটা আর বিজ্ঞানসম্মত থাকে কি-না?

আরোহের ভিত্তি কি তাও বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। শুধু গাণিতিক প্রতীক নয়, ভাষা দিয়ে চিন্তা করতে বলছি এজন্য যে, স্বয়ং মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন নিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন। কারণ এর মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্য উপাদান-উপকরণ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ﺃَﻓَﻼَ ﻳَﺘَﺪَﺑَّﺮُﻭْﻥَ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥَ ﻭَﻟَﻮْ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦْ ﻋِﻨْﺪِ ﻏَﻴْﺮِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻟَﻮَﺟَﺪُﻭْﺍ ﻓِﻴْﻪِ ﺍﺧْﺘِﻼَﻓًﺎ ﻛَﺜِﻴْﺮًﺍ – ‘তারা কেন কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? যদি এটা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারু নিকট থেকে আসত, তাহ’লে তারা এর মধ্যে বহু গরমিল দেখতে পেত’ (নিসা ৪/৮২) । এর সাথে দেখুন সূরা ইউনুস ১০১ (১ম অংশ)। কুরআন জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়ার জন্য (জুম‘আ ২) , এটি জ্ঞানীদের জন্য সুস্পষ্ট নিদর্শন স্বরূপ (আনকাবূত ২৯/৪৯) এবং কুরআন বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশস্বরূপ (গাফির/মুমিন ৪০/৫৪; ছোয়াদ ৩৮/২৯)।

বিজ্ঞান কি ও কেন?

সাদামাটা উত্তর হ’ল- বিজ্ঞান হচ্ছে এমনই কিছু যার সাহায্যে একরকম Generalized বা ‘সর্বক্ষেত্রে সত্যি আর সত্যি হ’তে বাধ্য’ জ্ঞান পাওয়া যায়। একে সাদামাটা জবাব বলছি কেন? কেননা শুধু এটুকু বললেই বিজ্ঞানের স্বরূপকে পুরোপুরি বুঝানো হয় না, আরো অনেক কথা বাকী থাকে।

প্রথমত : বিজ্ঞান জ্ঞান দিচ্ছে এবং সে জ্ঞানটা সত্যি, নির্ভুল। কার জ্ঞান? কী সম্বন্ধে জ্ঞান? দুনিয়ার জ্ঞান। দুনিয়া সম্বন্ধে জ্ঞান। দুনিয়া ছাড়া আমরা আর কী সম্বন্ধে জ্ঞান পেতে পারি? যাকিছু জানতে

চাই, বুঝতে চাই, তা সবই তো এই দুনিয়ার জিনিস, সবই দুনিয়ায় রয়েছে। মহাকাশের মধ্যে ছড়ানো গ্রহ-নক্ষত্র, নীহারিকা থেকে শুরু করে পৃথিবীর এতটুকু ধূলিকণা পর্যন্ত সবকিছুই এই দুনিয়ার জিনিস, দুনিয়ার মধ্যে রয়েছে।

‘বিজ্ঞান’ শব্দের ‘বি’ উপসর্গ বাদ দিলে আসে জ্ঞানের কথা। মানুষ ইন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক…) ছাড়াও অনুমানের সাহায্যে (মস্তিষ্ক) জ্ঞান পেয়ে থাকে এবং অনুমানের আসল ভিত্তি হ’ল এমন কোন জ্ঞান যা সব ক্ষেত্রে সত্যি এবং সত্যি হ’তে বাধ্য। যেমন Mathematics- এ কোন থিওরি Generalized করতে হ’লে প্রথমে সরলতম (Simplest) ক্ষেত্রে তা প্রমাণ করতে বা সত্য দেখাতে হয় এবং পরে ধারাবাহিকভাবে n শক্তির জন্য, n=1, 2, 3… এভাবে সত্য পাওয়া গেলে তাকে Generalized Method of Induction বলা হয়।

জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম অহী :

এই মাটির পৃথিবীতে মানবীয় জ্ঞান ব্যতীত আরও একটি জ্ঞানের মাধ্যম আছে। যার নাম অহী। অহী হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত। অহী মানবীয় জ্ঞান নয়, এটা আল্লাহ প্রদত্ত বলেই এতে কোন ভুল, কোন বিভ্রান্তি, কোন অসঙ্গতি, কোন প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও সীমাবদ্ধতা নেই। এ জ্ঞান সর্বপ্রকারের মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত(বাক্বারাহ ২/২) । এ জ্ঞান একদেশদর্শিতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এ জ্ঞান অভ্রান্ত, অখন্ডনীয়, সর্বকালীন ও সার্বজনীন, সর্বদেশের গণমানুষের মানবিক মুক্তি ও কল্যাণের একমাত্র সঠিক পথ। স্থান, কাল, পাত্র, পরিবেশ এবং পরিস্থিতি বদলে গেলেও এ জ্ঞান কখনো অচল হয় না।

চিন্তা করার জন্য তা-ই সবচেয়ে ভালটার রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। আবার যদি অন্য ধর্মের কোন ব্যক্তি তার গ্রন্থকে অহী হিসাবে দাবী করে? তখনও কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যাচাই (Scientific Way) করে দেখতে হবে (নিসা ৪/৮২) ।

মানবীয় জ্ঞানের উৎস :

মানবীয় জ্ঞানের উৎস হচ্ছে তিনটি- অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শক্তি। অভিজ্ঞতা হ’ল মানবীয় জ্ঞানের অন্যতম উৎস। বলা হয়ে থাকে, অভিজ্ঞতাই জ্ঞান। আজকের বিস্ময়কর মানব সভ্যতা বহুলাংশে অভিজ্ঞতারই ফসল। এ অভিজ্ঞতা প্রসূত জ্ঞানের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। মানবীয় অভিজ্ঞতা কোন একক সত্যের দাবী করতে পারে না। স্থান, কাল, পাত্রভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন রূপ হয়ে থাকে। মানবীয় অভিজ্ঞতায় অনেক সময় ভুল-ভ্রান্তি থাকে। এছাড়া দেশ, কাল ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলে যাবার সাথে সাথে মানবীয় জ্ঞান অচল মুদ্রায় পরিণত হয়। সে অভিজ্ঞতা ব্যক্তি, দল, জাতি বা জাতীয় সংসদের যারই হোক না কেন। যার ফলে জাতীয় সংসদে রচিত আইন ও সংবিধানের সংশোধনী আনতে হয়। কাজেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান চূড়ান্ত ও অভ্রান্ত নয়।

মানবীয় জ্ঞানের দ্বিতীয় উৎস হ’ল ইন্দ্রিয়শক্তি। এর মাধ্যমে মানুষ অনেক জ্ঞান লাভ করতে পারে। এই ইন্দ্রিয় শক্তির পরিধি ও ক্ষমতার মাঝে একটা সীমাবদ্ধতা আছে। এছাড়া অনিবার্য কোন কারণেও মাধ্যমটির বিকৃতি ঘটতে পারে। যেমন- দেহে জ্বর উঠলে মিষ্টি লাগে তেতো, সর্দি হ’লে নাকে কোন গন্ধ পাওয়া যায় না, জন্ডিস হ’লে রোগী চারিদিক হলুদ দেখে (চোখ)। কাজেই ইন্দ্রিয় শক্তিও নির্ভুল জ্ঞানের মাধ্যম নয়।

মানবীয় জ্ঞানের তৃতীয় উৎস হ’ল মানুষের বুদ্ধি। তবে এ মাধ্যমটিরও সীমাবদ্ধতা আছে। সীমার বাইরে এর কোন ক্ষমতা নেই। মানবীয় বুদ্ধি সবার সমান নয়। আর মানবীয় বুদ্ধি কোন একক সত্যের দাবী করতে পারে না। এছাড়া অনেক কারণে মানবীয় বুদ্ধি লোপ পেতে পারে (শরীর বৃত্তীয় কারণ, বয়স… ইত্যাদি)।

বস্ত্ততঃ মানবীয় জ্ঞানের প্রতিটি মাধ্যমে দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা আছে। অভিজ্ঞতার দ্বারা যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা ইন্দ্রিয় শক্তির দ্বারা অর্জন করা যায় না। বুদ্ধি দিয়ে যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা ইন্দ্রিয় শক্তি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অর্জন করা যায় না। যেমন একটি আম মিষ্টি না টক, তা বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতা দিয়ে জানা যায় না। এ জ্ঞান দান করে ইন্দ্রিয় শক্তি। কোনটা ভাল, কোনটি মন্দ, কি করণীয়, কি বর্জনীয় তা দান করতে পারে মানবীয় বুদ্ধি। এটা ইন্দ্রিয় শক্তি দিয়ে পারে না। অতীত সম্পর্কে কোন ধারণা বা বুদ্ধি ইন্দ্রিয় শক্তি দিতে পারে না। তা দিতে পারে মানবীয় অভিজ্ঞতা।

আসলে মানবীয় জ্ঞানে রয়েছে অনেক ভুল, বিভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা। এর মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তাতে আছে বস্ত্তজগতের সম্পর্ক, স্থান-কাল-পাত্রের প্রভাব। এ জ্ঞান বস্ত্তজগতের বাইরের কোন মহাসত্যের সন্ধান দিতে পারে না। ফলে দৃশ্যমান বস্ত্তজগতই মানুষের কাছে একমাত্র সত্য বলে মনে হয়। এর ঊর্ধ্বে অধার্মিক ব্যক্তি মনে করে, কোন শক্তি নেই, সত্য নেই… এভাবে বিশ্বজগতের মাঝে মানুষ নিজেকে স্বাধীন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী মনে করে। এই চিন্তা চেতনায় মানুষের মনে ভোগবাদের সৃষ্টি হয়। কোন কোন মানুষ বিশ্বাস করে যে, মরণের পর আর কোন জগৎ ও জীবন নেই, এই ইহকালীন জীবনই একমাত্র চরম ও পরম সত্য। এ বিশ্বের বস্ত্তসামগ্রীর ওপর রয়েছে তার জন্মগত অধিকার। সে স্বীয় শক্তি, মেধা ও বুদ্ধি দ্বারা যত পারবে ভোগ করবে। পৃথিবীটা ভোগের চারণভূমি। সর্বগ্রাসী ভোগের নেশায় মানুষ হয়ে যায় খুনী, ডাকাত, চোর, হাইজ্যাকার, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, ধর্ষণকারী, যুদ্ধবাজ, মাতাল, জুয়াড়ী ইত্যাদি। মাটির পৃথিবী মানুষের রক্তের বন্যায় ভেসে যায়, চলে নিহত মানুষের লাশের মিছিল। আর্তমানবতার আর্তনাদে কেঁদে ওঠে আকাশ-বাতাস।

বিজ্ঞানের ধর্মীয় ভিত্তি :

আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন যারা তাদের মধ্যে বিজ্ঞানী নিউটন ও বয়েল অন্যতম মানবীয় অভিজ্ঞতা এবং আরও নির্দিষ্টভাবে আধুনিক ভৌত বিজ্ঞানসমূহের পরীক্ষামূলক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। যারা তাদের আবিষ্কারের কাহিনীগুলো পড়েছেন, তারা সবাই জানেন। বিজ্ঞানকে জ্ঞানের ভিত্তি ধরে ধর্মীয় বিশ্বাসকে যদি আমরা দর্শন বলি, তবে এদের সম্পর্ক হ’ল বিজ্ঞান এজেন্ডা নির্ধারণ করে এবং আবিষ্কার করে সেখানে দর্শন ঐ বিজ্ঞানের ফলাফল সমূহকে স্পষ্ট (Clarify) ও ব্যাখ্যা করে। এই অর্থে দর্শন epistemology বা জ্ঞানতত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত। এটা অনুসন্ধান করে আমরা কী জানি তা কিভাবে জানব (যাচাই করব)। (এজন্য এতক্ষণ ধরে জ্ঞানের বিভিন্ন উৎস ও অহি-র নির্ভুলতার বর্ণনা দেয়া হ’ল)। এটা (জ্ঞানতত্ত্ব) নিজে কোন আবিষ্কার করবে না। এমনকি নতুন কোন জ্ঞানও উৎপাদন করে না। এটা বিজ্ঞানকে অনুসরণ করে। কিন্তু এর ওপর বিচার করতে বসে না। মেটাফিজিক্স (অধিভৌতবিদ্যা) যা কিনা সার্বিকভাবে বিজ্ঞান এবং নির্দিষ্টভাবে পদার্থ বিজ্ঞানের গন্ডীর বাইরে কোন বাস্তবতার ধারণা পরিহার করতে হবে। Wittgenstein দেখিয়েছেন, মেটাফিজিক্সের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং মানুষের জীবনযাপনের উপায়গুলোতে (বিভিন্ন ধর্মের লাইফস্টাইল) ধর্মীয় বিশ্বাস কি পার্থক্য সৃষ্টি করে সে বিষয়ে প্রশ্ন রেখেছেন। ধর্মীয় ভাষার অর্থ এই অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটা জনসাধারণের চর্চা/অভ্যাসের ওপর কি ভূমিকা রাখে তারই ওপর নির্ভরশীল। ধর্মের কাজই হ’ল তাদের জীবনপদ্ধতির ওপর যা ধর্মকে গুরুত্ববহ বা তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।

আধুনিক যুগে বিজ্ঞান শূন্যের মধ্যে আবির্ভূত হয়নি। কেন অনুমাননির্ভর যুক্তির প্রতি ঝোঁক বা রুচিকে প্রতিস্থাপিত করে আধুনিক পরীক্ষণীয় যুক্তির প্রতি জোর দেয়া হয়েছিল? পৃথিবীর কেমন থাকার কথা/থাকতে হবে- এর ভিত্তিতে কাজ করার চাইতে বিজ্ঞানীগণ অনুসন্ধান শুরু করলেন প্রকৃতপক্ষে এটি (পৃথিবী) কি? তখনই ভৌতজগতের অনিশ্চিত সম্ভাবনার স্বীকৃতি বাড়তে লাগল। ভাবা হ’ল, কোন নির্দিষ্ট উপায়ে বিশ্বসৃষ্টির প্রয়োজন নেই। উদাহরণস্বরূপ, বয়েল বিশ্বাস করতেন (এখানে ভাবার্থ দেয়া হচ্ছে, …বয়েল ‘গড’ বলতেন, আমি (লেখক) মুসলিম হিসাবে ‘আল্লাহ লিখছি)- প্রকৃতির নিয়ম বা আইনগুলো সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তাঁর (আল্লাহর) নিজস্ব সত্তার বাইরে তিনি কোনকিছু দ্বারা সীমাবদ্ধ বা বাধ্য ছিলেন না। এর অর্থ বাস্তবিকপক্ষে বিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তা দেখার জন্য মানবীয় যুক্তি ব্যবহার করতে হবে। তদুপরি এটি সৃষ্ট হয়েছে একটি স্বর্গীয় মানস/সত্তা দ্বারা, যার মধ্যে সুশৃংখল ক্রম ও ডিজাইন (নকশা) বিদ্যমান। ভৌতজগৎ আচরণ করে আল্লাহর ইচ্ছার মধ্য দিয়ে একটি নিয়মিত এবং এজন্য স্বাভাবিকভাবেই পূর্বনির্ধারিত বা ভবিষ্যৎবাচ্য নিয়মে। এখানে দু’টি কথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ : (i) আল্লাহর ইচ্ছা (ii) পূর্বনির্ধারিত/ভবিষ্যৎ বাচ্য (… এই ঘটবে, … এরকম করব, … এরকম হবে)। ঠিক এভাবেই আল্লাহর অধিকাংশ নে‘মত (জান্নাতের) ও জাহান্নামের শাস্তির কথা বর্ণিত আছে পবিত্র কুরআন মাজীদে। আবার আসমান-যমীন, গ্রহ-নক্ষত্রের সমস্ত বিষয়ই যে পূর্বনির্ধারিত তাও ঘোষিত হয়েছে : কক্ষপথ, পরিক্রমণকাল, সৃষ্টির শুরু, ধ্বংস/ক্বিয়ামত সবই আল্লাহ রাববুল আলামীন নির্ধারণ করে রেখেছেন। অহী-র মাধ্যমে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলা নিজের সে যাত-ছিফাতের বর্ণনা দিয়েছেন, তাঁর মহান একক শক্তি সর্ববিষয়ে ও সৃষ্টিকুশলতার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, মূলতঃ সেসবের মাধ্যমেই বিশ্বসৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এসব বর্ণনার সাথে এমন সব ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে যা মানুষের চোখে সব সময় দৃশ্যমান।

কোন কোন বর্ণনায় আল্লাহ পাকের নির্ধারিত এমন সব নিয়ম-রীতির উল্লেখ করা হয়েছে, যেসব বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাকৃতিক নিয়মের মাধ্যমে আল্লাহ পাক বিশ্বজগৎ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করছেন। এইসব নিয়ম-রীতির অন্তরালে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যে পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া চালু রয়েছে, পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য-জ্ঞানের মাধ্যমেই তা অনুধাবন করা সম্ভব। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে যুক্তি বুদ্ধি দিয়েছেন, আমরা পৃথিবীকে বোধগম্য বা বুদ্ধিগ্রাহ্যভাবে খুঁজে দেখার আশা করতে পারি। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা কি দেখে না/লক্ষ্য করে না, … তোমরা কি লক্ষ্য কর না? … নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীলদের/জ্ঞানীদের/বুদ্ধিমানদের জন্য..’। এরকম নির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত করা বা প্রশ্ন করা কখন সম্ভব? যখন উদ্দিষ্ট কার্যকারণ বিশ্লেষণ করার মতো, উপলব্ধির মতো, দেখার মতো System বা ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে থাকে, যা মহান আল্লাহ দিয়ে পাঠিয়েছেন।

চলুন বিজ্ঞ পাঠক! দেখা যাক মহান রাববুল আলামীন যেসব বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাকৃতিক নিয়ম, ঘটনাবলী, সৃষ্টিকুশলতার বিবরণ দিয়েছেন পবিত্র কুরআন মাজীদে, সেগুলোর আমরা সারমর্ম বোঝার চেষ্টা করি।

আকাশ ও আকাশমন্ডলীর সৃষ্টি ও বিন্যাস সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽَ ﻓِﺮَﺍﺷًﺎ ﻭَﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀَ ﺑِﻨَﺎﺀً ﻭَﺃَﻧْﺰَﻝَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﻣَﺎﺀً ﻓَﺄَﺧْﺮَﺝَ ﺑِﻪِ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮَﺍﺕِ ﺭِﺯْﻗًﺎ ﻟَﻜُﻢْ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﺠْﻌَﻠُﻮﺍ ﻟِﻠَّﻪِ ﺃَﻧْﺪَﺍﺩًﺍ ﻭَﺃَﻧْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ – ‘যিনি তোমাদের জন্য ভূপৃষ্ঠকে বিছানা স্বরূপ ও আকাশকে ছাদ স্বরূপ করেছেন এবং যিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দিয়ে তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-শস্যাদি উৎপাদন করেন। অতএব তোমরা জেনে শুনে কাউকে

আল্লাহর সাথে সমকক্ষ নির্ধারণ করো না’

(বাক্বারাহ ২/২২) ।[1]

দুনিয়ার আকাশকে প্রদীপমালায় সজ্জিতকরণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺯَﻳَّﻨَّﺎ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀَ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﺑِﻤَﺼَﺎﺑِﻴﺢَ ﻭَﺟَﻌَﻠْﻨَﺎﻫَﺎ ﺭُﺟُﻮﻣًﺎ ﻟِﻠﺸَّﻴَﺎﻃِﻴﻦِ ﻭَﺃَﻋْﺘَﺪْﻧَﺎ ﻟَﻬُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏَ ﺍﻟﺴَّﻌِﻴﺮِ ‘আমরা নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং এদের করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্য প্রস্ত্তত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি’ (মুলক ৬৭/৫) ।

গ্রহসমূহ, নক্ষত্র-তারকারাজি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻭَﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟﻨُّﺠُﻮْﻡَ ﻟِﺘَﻬْﺘَﺪُﻭْﺍ ﺑِﻬَﺎ ﻓِﻲْ ﻇُﻠُﻤَﺎﺕِ ﺍﻟْﺒَﺮِّ ﻭَﺍﻟْﺒَﺤْﺮِ ﻗَﺪْ ﻓَﺼَّﻠْﻨَﺎ ﺍﻟْﺂﻳَﺎﺕِ ﻟِﻘَﻮْﻡٍ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ – ‘তিনি তোমাদের জন্য নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা এর মাধ্যমে স্থলভাগে ও সমুদ্রভাগে অন্ধকার পথের দিশা পাও। আমরা জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন সমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি’ (আন‘আম৬/৯৭) ।[2]

সূর্য-চন্দ্রের কক্ষপথ, গতিপথ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি সূর্যকে করেছেন কিরণময় ও চন্দ্রকে করেছেন জ্যোতির্ময় এবং ওর গতির জন্য মনযিল সমূহ নির্ধারণ করেছেন। যাতে তোমরা বছরের গণনা ও সময়ের হিসাব করতে পার। আল্লাহ এগুলিকে সত্য সহকারে সৃষ্টি করেছেন। তিনি নিদর্শন সমূহ সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন বিজ্ঞ সম্প্রদায়ের জন্য’ (ইউনুস ১০/৫) ।[3]

দিন-রাত্রির ধারা সম্পর্কে এসেছে, ﺗُﻮﻟِﺞُ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞَ ﻓِﻲ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭِ ﻭَﺗُﻮﻟِﺞُ ﺍﻟﻨَّﻬَﺎﺭَ ﻓِﻲ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ﻭَﺗُﺨْﺮِﺝُ ﺍﻟْﺤَﻲَّ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤَﻴِّﺖِ ﻭَﺗُﺨْﺮِﺝُ ﺍﻟْﻤَﻴِّﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺤَﻲِّ ﻭَﺗَﺮْﺯُﻕُ ﻣَﻦْ ﺗَﺸَﺎﺀُ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺣِﺴَﺎﺏٍ – ‘তুমি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করাও এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করাও। তুমি জীবিতকে মৃত থেকে বের কর এবং মৃতকে জীবিত থেকে বের কর। আর তুমি যাকে খুশী বেহিসাব রিযিক দান করে থাক’ (আলে ইমরান ৩/২৭) ।[4]

দিবা-রাত্রির পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে এসেছে, ‘তুমি কি দেখ না আল্লাহ রাত্রিকে দিবসে এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত করেন? তিনি চন্দ্র-সূর্যকে করেছেন নিয়মাধীন, প্রত্যেকটি বিচরণ করে নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত; তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত’ (লোকমান ৩১/২৯) ।[5]

বীজ থেকে উদ্ভিদ উদ্গত করা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻓَﺎﻟِﻖُ ﺍﻟْﺤَﺐِّ ﻭَﺍﻟﻨَّﻮَﻯ ﻳُﺨْﺮِﺝُ ﺍﻟْﺤَﻲَّ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤَﻴِّﺖِ ﻭَﻣُﺨْﺮِﺝُ ﺍﻟْﻤَﻴِّﺖِ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺤَﻲِّ ﺫَﻟِﻜُﻢُ ﺍﻟﻠﻪُ ﻓَﺄَﻧَّﻰ ﺗُﺆْﻓَﻜُﻮْﻥَ – ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ দানা ও বীজ উৎপাদনকারী। তিনি জীবিতকে মৃত হ’তে বের করেন এবং মৃতকে জীবিত হ’তে বের করেন। তিনিই আল্লাহ। অতএব তোমরা কোথায় ঘুরছ? (আন‘আম ৬/৯০) ।

প্রভাতের উন্মেষ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻓَﺎﻟِﻖُ ﺍﻟْﺈِﺻْﺒَﺎﺡِ ﻭَﺟَﻌَﻞَ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞَ ﺳَﻜَﻨًﺎ ﻭَﺍﻟﺸَّﻤْﺲَ ﻭَﺍﻟْﻘَﻤَﺮَ ﺣُﺴْﺒَﺎﻧًﺎ ﺫَﻟِﻚَ ﺗَﻘْﺪِﻳﺮُ ﺍﻟْﻌَﺰِﻳﺰِ ﺍﻟْﻌَﻠِﻴﻢِ – ‘তিনি প্রভাতরশ্মির উন্মেষকারী। তিনি রাত্রিকে বিশ্রামকাল এবং সূর্য ও চন্দ্রকে সময় নিরূপক হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। এটি হ’ল মহাপরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী (আল্লাহর) নির্ধারণ’ (আন‘আম ৬/৯৬) ।

বায়ু সঞ্চালন সম্পর্কে কুরআনে এসেছে, ‘তিনিই বৃষ্টির পূর্বে সুসংবাদবাহী হিসাবে বায়ু প্রবাহ প্রেরণ করেন। অবশেষে যখন ঐ বায়ুরাশি পানিপূর্ণ মেঘমালাকে বহন করে আনে, তখন আমরা তাকে কোন নির্জীব ভূখন্ডের দিকে হাঁকিয়ে নেই। অতঃপর ওটা থেকে বারি বর্ষণ করি। অতঃপর তার মাধ্যমে সকল প্রকার ফল-ফলাদি উৎপন্ন করি। এভাবেই আমরা (ক্বিয়ামতের দিন) মৃতদের জীবিত করব। এ থেকে সম্ভবতঃ তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে’ (আ‘রাফ ৭/৫৭) ।

এছাড়াও প্রাণী জগতের প্রজনন, গবাদিপশুর দুধের উৎস, উদ্ভিদ জগৎ, উদ্ভিদ জগতের প্রজনন, জন্তুজগতের সামাজিক বন্ধন, নানা প্রকার খাদ্য, খাদ্যচক্র, মৌমাছি, মাকড়সা, পাখি প্রভৃতি সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় সবিস্তর বিবরণ এসেছে।

উপরে উল্লিখিত আয়াতগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আমরা যে বিশেষ তথ্য পাই তা নিম্নরূপ-

১. মহান আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি কৌশলের বর্ণনা Mechanism, Strategy -আকাশ, পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, সমুদ্র, উদ্ভিদ, প্রাণী ইত্যাদির সৃষ্টির বর্ণনা।

২. প্রশ্ন আকারে বান্দার দৃষ্টি আকর্ষণ- এসব সৃষ্টি/নে‘মত থেকে বিস্ময় প্রকাশ, মহান আল্লাহর বড়ত্ব (আল্লাহু আকবার) স্মরণ করা এবং সামগ্রিকভাবে তাঁর প্রতি ঈমান আনা।

৩. চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে যে, আর কে আছে এসব সৃষ্টি করতে পারে বা এরকম বিস্ময়কর নে‘মত তোমাদেরকে দিতে পারে?[6]

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিজ্ঞানের ভিত্তি হ’ল : ১. মানবীয় অভিজ্ঞতা ২. পরীক্ষামূলক পদ্ধতি।

১. মানবীয় অভিজ্ঞতা কি বলে? : (১) জীবন-যাপন ও জীবনের উপকরণের জন্য প্রকৃতির উপর নির্ভরতা : যেমন- আলো, বাতাস (বায়ুমন্ডল), পানি (বৃষ্টি), নৌযান, গাছপালা, উদ্ভিদ প্রাণী ইত্যাদি।

২. প্রকৃতির নিয়ম, আইন, আদেশ (Order), নিয়ন্ত্রণ (Regulation) সব আল্লাহর। তিনি কারও মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল নন, সীমাবদ্ধ নন। তাঁকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না।

সুতরাং বান্দা যদি এসব দৃষ্টান্ত থেকে উপলব্ধি করতে পারে :

১। একমাত্র সর্বশক্তিমান, রাববুল আলামীন আল্লাহ ছাড়া কেউ এগুলো সৃষ্টি করতে, পুনর্জীবিত করতে, তাদের হিসাব ও কক্ষপথ নির্ধারণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে না।

২। সম্পূর্ণ তাঁরই ইচ্ছায় চলে, তাঁর ইচ্ছার জন্য তিনি কারও কাছে জবাবদিহি করবেন না, তাঁকে কোন প্রশ্ন করা হবে না (আম্বিয়া)।

৩। মানুষ কত বেশী অসহায়, কত অপরিহার্যভাবে এসবের উপর নির্ভরশীল! তবে তার (বান্দার) জন্য আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা অপরিহার্য হয়ে যায়।

বিজ্ঞান ও ধর্ম :

আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি যে, কিভাবে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস সত্যিকারভাবে বিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ করে। জগতের ক্রমব্যবস্থার প্রতি পূর্ণবিশ্বাস ছাড়া এটা বিচার করা সব সময়ই অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রকৃত নিয়মতান্ত্রিকতা/বিধিবদ্ধতা ও বাস্তব মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান নির্মিত হয়েছে, না-কি একটি ধারাবাহিক সমস্থানিকতার মধ্য দিয়ে। যেটা আমাদেরকে বিন্যাস এবং নিয়মানুবর্তিতার একটি বিভ্রান্তিকর অবয়ব দেয় (মুরগী আগে না ডিম আগে)। একইভাবে, এক সৃষ্টিকর্তার প্রতি একটি ধর্মীয় বিশ্বাস, যিনি যুক্তি এবং জ্ঞানের উৎস, বিজ্ঞানের আবিষ্কারসমূহকে আলিঙ্গন করায়। যদি প্রকৃতির বিভিন্ন বৈচিত্র্য- আকাশ, পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, মেঘমালা, বৃষ্টি, বায়ু প্রবাহ, নৌযান সমূহ, উদ্ভিদ, গবাদি পশু ইত্যাদি সত্যিই কোন জ্ঞানের উদ্রেক করে বা বিস্ময়কর তথ্য দেয় এদের সৃষ্টিকৌশল ও কুশলতা/নিপূণতা, পরিচালন-রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে; তবে তা নাযিলকৃত কিতাবের সাথে সাংঘর্ষিক হ’তে পারে না। একারণেই বিজ্ঞানের সাথে মহান আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআন মাজীদের কোন বিরোধ নেই।

পরবর্তীতে যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশ এলো এটা বোঝাতে যে, যুক্তি হ’ল ধর্মের শত্রু। যুক্তি সংযুক্ত হ’ল আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে, এর সবচে বড় আদর্শ হিসাবে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণভাবে, কোন উপায়ে দেখা হ’ল যৌক্তিকতার কাছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হিসাবে। বিশ্বাস ভাসে বিনা যুক্তিতে বা যুক্তিহীনতায়। তবুও বিশ্বাস সব সময়ই স্বয়ং কোন কিছুতে বা কারও ওপর বিশ্বাস। যুক্তি ছাড়া আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি না আমরা কিসে বিশ্বাস করি। যুক্তির সংযোগ ঘটাতে হবে এক বিশ্বের সাথে যেখানে আমরা সবাই বাস করি। বিজ্ঞানের জগৎ ধর্মের জগৎ থেকে পৃথক কিছু নয়। তবুও এখন পর্যন্ত এসব পূর্ব অনুমান বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে একটি দ্বিমুখী চলাচল (টু-ওয়ে ট্রাফিক)। উভয়টিতেই যৌক্তিকতা আদর্শায়িত এবং উভয়টিই বাস্তবতার সাথে সংশ্লিষ্ট। তাদের রয়েছে পৃথক পদ্ধতি এবং বিষয়বস্ত্ত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় য, একটিকে অপরটি থেকে বাক্সবন্দী করে রাখা যেতে পারে। স্রষ্টার অস্তিত্ব আমাদেরকে ভৌতজগতের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে কিছু বলতে পারবে। তেমনি ভৌতজগতের বৈশিষ্ট্য আমাদেরকে স্রষ্টার মহিমা সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দিতে পারে। এই পরস্পর নির্ভরতা এবং পরস্পর থেকে শেখার ইচ্ছা সামগ্রিকভাবে সমকালীন চিন্তাধারার অংশ নয়। কিছু বিজ্ঞানী আক্রমণাত্মকভাবে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ব্যবহার করেন কোন ধর্মীয় বুঝকে বাদ দেওয়ার জন্য, বিবেচনার অযোগ্য বলে ঘোষণা করার জন্য। আবার কেউ কেউ সহনশীল হ’তে এবং ধর্মকে এর নিজস্ব গন্ডীর মধ্যে থাকতে দিতেই খুশি থাকেন। ইতিবাচক দৃষ্টিতে, ধর্মকে পরিস্কারভাবে যুক্তির প্রভাবের বাইরে রাখা আছে। বিজ্ঞান তার ওপর (যুক্তির) একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

নগণ্য সংখ্যক বিজ্ঞানীর কথা বাদ দিলে বেশির ভাগ বস্ত্তবাদী মনোভাব সম্পন্ন বিজ্ঞানীকে দেখা যায়, তাঁরা যখন প্রচলিত কোন কাহিনী কিংবা উপকথায় ধর্মীয় কোন প্রশ্ন দেখতে পান কিংবা পাশ্চাত্য জগতে ধর্ম আর বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে যখন কোন আলোচনা চলে, তখন সবাই ধর্ম বলতে সাধারণভাবে ইহুদী ও খৃষ্টধর্মের কথা বলে থাকেন। ঘুর্ণাক্ষরেও কেউ ইসলামের কথা ভাবেন না বা বলেন না। কাজেই অহী বা ইলাহীবাণীর সাথে বিজ্ঞানের কোন বিরোধ আছে কি নেই সে সম্বন্ধে কিছু জানতে হ’লে আগে ইসলাম ধর্মের রূপরেখা সম্পর্কে জানতে হবে। ধর্ম ও বিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্ক দেশে দেশে যুগে যুগে কোন সময়ই এক রকম ছিল না। একথা সত্য যে, একত্ববাদী কোন ধর্ম গ্রন্থে বিজ্ঞানের বিরোধিতা কিংবা নিন্দাসূচক কোন বক্তব্য নেই। কিন্তু বাস্তবে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোন কোন ধর্মের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের দ্বারা বিজ্ঞানীগণ যে নিদারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন, তা অস্বীকার করা যায় না। (৮ম থেকে ১২শ শতাব্দী)। কিন্তু ইসলামী বিশ্বের ধর্মীয় ভাবধারা একই সঙ্গে ধর্মের বিশ্বাসী ও বিজ্ঞানী হওয়ার ব্যাপারে কোন মানুষের জন্যে কোন রকম বাঁধার সৃষ্টি করেনি। ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় কিতাবেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি কোন অনীহা ছিল না।

বিজ্ঞান ও বস্তুবাদ :

স্রষ্টার অস্তিত্ব বা তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে উপরোক্ত ধরনের আস্তিক্যবাদী কথাবার্তা নাস্তিক, অভিজ্ঞতাবাদী ও প্রগতিবাদীদের অনেকের কাছে ঘৃণিত বা অভিশপ্ত বস্ত্ত। ‘বাস্তবতার বিভিন্ন স্তর’ এর ধারণা অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করা হবে। তাদের মতে, কেবলমাত্র একটিই বাস্তবতা আছে, আমাদেরকে বলা হবে এবং সেটা হ’ল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মানবীয় যুক্তিতে যা সহজলভ্য। যা বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রমাণ করা যায় না তার অস্তিত্ব থাকতে পারে না। যার অস্তিত্ব আছে তাকে মানুষের ধারণা ও যুক্তিতে প্রবেশযোগ্য থাকতে হবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে এই ধারণাটিই পরিস্কারভাবে বাস্তবতার বৈশিষ্ট্যকে সীমায়িত বা সীমাবদ্ধ করে। আত্মা (স্পিরিট) এবং অন্যান্য ঘটনা যা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে প্রমাণ করা যায় না সেগুলো অস্তিত্বহীন হিসাবে বিবেচিত। বস্ত্তই কাজ করে, আত্মা নয় (Matter does and Spirits donot) এই মতবাদ বস্ত্তবাদের একটি রূপ। আস্তিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমস্যা হ’ল অদৈহিক বা অভৌত ব্যাখ্যার বিষয়ে অত্যধিক বিশ্বাসপ্রবণ না হওয়াটা যখন হয়ত বিজ্ঞোচিত হ’তে পারে, তখন এদেরকে একেবারে বাদ দেওয়াটাও আল্লাহর অস্তিত্বের কোন সম্ভাবনাকেও অবশ্যই মুছে ফেলে।

যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশের কাল যতই উন্নত হ’ল, মানবীয় যৌক্তিকতা এর আস্তিকতার শিকড় ভুলে যাওয়ার প্রবণতার দিকে গড়াল, এমনকি যদিও সেগুলো আমাদের বুঝ/উপলব্ধির আংশিক নির্ভরযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতার ন্যূনতম নিশ্চয়তা দিত তবুও। ‘আমরা কিভাবে জানি’ এর উপর গভীর মনোযোগ দিল এবং হয়ে পড়ল নৃতত্ত্ব কেন্দ্রীক। আমরা সত্যের ধারণার প্রতি দৃঢ়তা হারাতে শুরু করলাম এবং আপেক্ষিকতাবাদে জড়িয়ে পড়লাম। প্রতিক্রিয়াশীলতা এখন সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর জোর দিচ্ছে বিশ্বাসের গঠনাত্মক উপাদান হিসাবে। আমরা বিশ্বাস করতে পারি আমরা কি চাই এবং সেটা আমাদের কোন কিছুতে বিশ্বাস করার জন্য কোন যুক্তি দেয় না। দীর্ঘদিন বিজ্ঞানকে চালিয়ে নেয়া হয়েছিল এর নিজস্ব সুস্পষ্ট সফলতার দ্বারা এটা ধর্ম বিশ্বাস সমূহকে ছুঁড়ে ফেলেছে যা তাকে প্রথম স্থান অর্জন সম্ভব করেছিল। এটা মানবীয় যুক্তির ক্ষমতা ও অর্জন সমূহকে গৌরবান্বিত করেছে।

মানুষের এই বস্ত্তবাদী ধ্যান-ধারণা ভোগবিলাসে এতদূর অন্ধ করে ফেলেছে যে, বিনা কারণে অন্যান্য মানুষের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে লিপ্ত হয়। যেসব জাতি এই বস্ত্তবাদ/জড়বাদকে অনুসরণ করছে তারা এক সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব ও গৃহবিবাদের করুণ শিকারে পরিণত হয়েছে। ফলে তাদের জীবনের সকল প্রকার ব্যবস্থাপনা ও রূপ-কাঠামো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং বিজ্ঞান ও তার আবিষ্কৃত মারণাস্ত্রগুলো মানবজাতিকে শান্তি দেয়ার পরিবর্তে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, মানবতার কল্যাণে অবতারিত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বিজ্ঞানের উৎস। যাকে গবেষণা করে পৃথিবী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উদ্ভাবন করা হয়েছে। আবার কুরআনের বিভিন্ন বর্ণনা ও তথ্য সহজে উপলব্ধির জন্য বিজ্ঞান সহায়ক। তাই বিজ্ঞান ও ধর্ম পরস্পরের বিরোধী নয়। যদিও অনেকে স্রেফ বিরোধিতার কারণে এতদুভয়ের মাঝে বিভিন্ন কৃত্রিম দ্বন্দ্ব মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন-আমীন!

[1]. এ সম্পর্কে আরো এসেছে, রা‘দ ১৩/২; আম্বিয়া ২১/৩২; হজ্জ ২২/৬৫; লোকমান ৩১/১০; জাছিয়া ৪৫/১৩; ক্বাফ ৫০/৬; আর-রহমান ৫৫/৭।
[2]. এ সম্পর্কে আরো এসেছে, নাহল ১৬/১২, ১৬; ফুরক্বান ২৫/৬১।
[3]. এ সম্পর্কে আরো এসেছে, আন‘আম ৬/৯৬; ইবরাহীম ১৪/৩৩; আম্বিয়া ২১/৩৩; ইয়াসীন ৩৬/৪০; আর-রহমান ৫৫/৫।
[4]. এ সম্পর্কে আরো এসেছে, আ‘রাফ ৭/৫৪; ইয়াসীন ৩৬/৩৭; যুমার ৩৯/৫; জাছিয়া ৪৫/৫; ক্বাছাছ ২৮/৭১-৭৩।
[5]. এ সম্পর্কে আরো এসেছে, ফাতির ৩৫/১৩; ইয়াসীন ৩৬/৩৮।
[6]. বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, নামল ২য় ২৭/৬০-৬৪; ক্বাছাছ ২৮/৭১-৭৩; মুলক ৬৭/৩০।